ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রতিদিন বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে গড়ে ১ হাজার ৭৮০ মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা পূরণে প্রতিবেশী দেশটি থেকে আনা বিদ্যুতের অবদান দাঁড়ায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশে। মূলত স্থানীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সংকট ও বকেয়া দায়ের কারণে ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আনা বিদ্যুতের ওপর জাতীয় গ্রিডের নির্ভরতা বেড়েছে। এর মধ্যে আবার জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ভারত থেকে পাইপলাইনে আনা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারত থেকে আমদানিনির্ভরতা শিগগিরই কাটিয়ে ওঠার কোনো সুযোগ দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে ১১-১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এনার্জি উইক সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সদস্য হিসেবে ভারত সফরে যাচ্ছেন তিনি। সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ও বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছেন তিনি। ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি এ সম্মেলনে অংশ নিয়ে তা শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফেরার কথা রয়েছে তার।
এনার্জি উইক সম্মেলনে আমন্ত্রণ পাওয়ার পর সেখানে তার যোগদানের বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এ বিষয়ে গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, ‘এনার্জি উইকে আমাকে বিশেষ অতিথি ও বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে সেখানে যাওয়ার বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার অনুমতির ওপর নির্ভর করছে।’
তার এ সফরে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানি সংক্রান্ত আলোচনার কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘না। এটা এনার্জি উইকের আমন্ত্রণ।’
জ্বালানি উপদেষ্টার ভারতে যাওয়ার বিষয়টিতে এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকতা বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছেন। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত সরকারি আদেশ মন্ত্রণালয়ে এসে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভারতের মিনিস্ট্রি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাসের উদ্যোগে ১১-১৪ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে এনার্জি উইক সামিট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ সামিটে অংশ নিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ১০ তারিখ বিকালে ঢাকা থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা দেবেন। ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি—এ দুইদিন সম্মেলনে অংশ নেবেন তিনি। সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই উপদেষ্টার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।’
দেশে বর্তমানে ভারত থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশটির ঝাড়খণ্ডে স্থাপিত আদানি পাওয়ারের গড্ডা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভারতের রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন রয়েছে।
এর মধ্যে আদানির সঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আওয়ামী লীগ আমলে করা ক্রয় চুক্তিটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি তুলেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং পর্যবেক্ষকরা। অসম এ ক্রয় চুক্তি বিপিডিবিসহ গোটা বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ও দায়ের বোঝাকে আরো ভারী করে তুলেছে বলে অভিযোগ তাদের। বিদ্যুৎ বিভাগের এ বকেয়া দায় দ্রুত কমানো না গেলে খাতটিতে ভারতনির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে আনার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সংস্থান নেই। আসন্ন গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুম এবং রমজানের জন্যও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সম্ভাব্য সরবরাহকে প্রাক্কলন করা হয়েছে ভারত থেকে আমদানীকৃত বিদ্যুৎকে হিসাবে নিয়ে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বকেয়া দায় মেটানো নিয়ে গতকালও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি আমদানি, বকেয়া দায় ও আদানির বিদ্যুৎসহ নানা প্রসঙ্গ উঠে আসে। এছাড়া সেখানে আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা এবং এতে সম্ভাব্য ঘাটতি কীভাবে মোকাবেলা করা হবে সে বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।